নার্সারি ব্যাবসা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা

কিশোরগঞ্জের গৌরীপুরে বিশাল একটি লটকন বাগান। প্রতিদিন অসংখ্য ছেলেমেয়ে লটকন বাগানে এসে খেলাধুলা করে এবং গাছে উঠে লটকন পেড়ে খায়। বাগানের ঠিক মাঝখানে একটি বড় লটকন গাছ আছে। সেটিতে কাউকে উঠতে দেয় না বাগানের মালিক। কী সেই রহস্য কেউ জানত না। অবশেষে জানা গেল সেই লটকন গাছের গোপন রহস্য। এটি এমন একটি গাছ যেটিতে প্রায় কমলার সমান লটকন হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (বিএডিসি) নার্সারিবিষয়ক প্রকল্প পরিচালক এস এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমি এ বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে ছুটে যাই এবং সেই লটকন দেখে অভিভূত হই। এই বিরল প্রজাতির লটকন গাছ থেকে আমি কিছু সায়ন নিয়ে আসি এবং কয়েকটি গুটি কলম তৈরি করে নার্সারির মাধ্যমে সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নিই। বর্তমানে সেই গাছটির অনেকগুলো চারা হয়েছে এবং আবার সেটি নার্সারিতে সম্প্রসারণের জন্য দেওয়া হয়েছে। এমনিভাবে আমি থাইল্যান্ড থেকে থাই-১ নামের একটি কুলের জাত নিয়ে আসি যা বর্তমানে বহুল আলোচিত বাউকুল নামে খ্যাত।’ শুধু নার্সারিব্যবস্থার সাহায্যে এটি সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
এভাবে ফলদ, বনজ, ওষধি ও মসলাজাতীয় বিভিন্ন গাছের প্রজাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া দেশের নার্সারি খাতের উন্নয়নের জন্য সরকার ‘সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন’ নামে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানসম্পন্ন ও অপ্রচলিত ফলের জাত সংরক্ষণ করা, আঞ্চলিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশেষ এলাকা তৈরি করা, যাতে করে সেখানে নার্সারিব্যবস্থার মাধ্যমে ফল, মসলা ও ফুলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্প তৈরি করা যায়। শহুরে উদ্যানবিদ্যাকে (আরবান হর্টিকালচার) আরও উন্নত করা এবং সব মিলিয়ে পরিকল্পিতভাবে নার্সারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সবুজায়ন ও সর্বস্তরে ফলের জোগান বাড়ানেই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। নার্সারি খাতের পরিধি বাড়াতে প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগও বাড়ছে।তাই এ খাতে বিনিয়োগ করে আপনিও হতে পারেন একজন সফল নার্সারির মালিক।
বাড়ছে প্রতিযোগিতা:
একসময় মানুষ শখের বশে বাড়ির আঙিনার আশপাশে গাছ লাগাত। বেসরকারিভাবে নার্সারির বিষয়টি কল্পনা করা যেত না। বর্তমানে নার্সারি খাতে ব্যাপক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৯-এর জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ছোটবড় মিলে প্রায় ১২ হাজার ব্যক্তিগত নার্সারি রয়েছে। বাংলাদেশ নার্সারি মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ হক জানান, প্রতিবছর নার্সারিতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে সামাজিক বন বিভাগের আয়োজনে জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে মাসব্যাপী বৃক্ষমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন পড়ে। সেখান থেকে বাছাই করে ১৫০টি প্রতিষ্ঠান গাছের স্টল দেওয়ার অনুমতি পায়। মেলায় অংশগ্রহণ করতে হলে বিশেষ কিছু নিয়ম পালন করতে হবে। সেগুলো হলো তিন ধরনের গাছ থাকতে হবে, যেমন- বনজ, ফলদ ও ওষধি। ট্রেড লাইসেন্স, পর্যাপ্ত পরিমাণে গাছের চারা থাকতে হবে ও পাঁচ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দিতে হবে ।
প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা:
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নার্সারি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে—বললেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হর্টিকালচার বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নার্সারি আইন ২০১০ পাস হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে নিবন্ধন ছাড়া কোনো ব্যক্তি নার্সারি তৈরি করতে পারবে না। চারা উত্তোলনের জন্য মাতৃবাগান থাকতে হবে, মানসম্মত চারা উত্তোলনের ক্ষেত্রে চারার বয়স অন্তত এক বছর হতে হবে, শেকড়ের চেয়ে কাণ্ডের দৈর্ঘ্য চার গুণ বেশি হতে হবে। এ ছাড়া সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের আর্থিক সহযোগিতায় সম্মিলিত কৃষি বনায়ন উন্নয়ন কার্যক্রম (এএফআইপি) নামে একটি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে নার্সারি উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এটি চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত চারার সর্বোপরি সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এর সঙ্গে সহযোগিতায় রয়েছে বংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্র্যাক ও প্রশিকা।
প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক জ্ঞান:
নার্সারি খাতে বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক জ্ঞান থাকতে হবে। এ সম্পর্কে কৃষিবিদ এম রাকিব জানান, যেহেতু আমাদের কৃষিপ্রধান দেশ সেহেতু গাছপালা রোপণ ও পরিচর্যার বিষয়ে সবার কমবেশি ধারণা আছে। তাই নার্সারিতে বিনিয়োগ একটি সহজ পদক্ষেপ বলা যায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নার্সারি মালিক, মালি ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে তাদের। এদের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ব্র্যাক, প্রশিকা অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদে নার্সারির সার্বিক কার্যক্রম বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণাসহ প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আসাদগেটের নার্সারিকে আরবান হর্টিকালচার ইনস্টিটিউটে রূপ দিতে যাচ্ছে। এতে শহরের সবুজায়ন ও নার্সারিতে বিনিয়োকারীদের প্রশিক্ষণে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
শুরু করবেন যেভাবে:
প্রথমেই আপনাকে নার্সারি আইন ২০১০ মোতাবেক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ব্যক্তিগত নিবন্ধন করে নিতে হবে। নার্সারিতে বিনিয়োগের জন্য পলিব্যাগ কিংবা মাটির পাত্র খুব জরুরি। সাধারণত পুরান ঢাকার চকবাজারসহ নিউমার্কেট, চানখারপুল ও আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন বাজারে এসব পাওয়া যেতে পারে। খুলনার ফুলপুর উপজেলা কৃষিবিদ পঙ্কজ কান্তি মজুমদার জানান, জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি দেখতে হবে সেটি হলো সুনিষ্কাশিত ও উঁচু জমি নির্বাচন করা। যাতে পানি জমে না থাকে। দোআঁশ মাটি নার্সারি বেড তৈরিতে উত্তম। প্রচুর পরিমাণে আলোবাতাস আছে এমন জমি নার্সারির জন্য বেশ উপযোগী। রাস্তার পাশে হলে ভালো। এতে নার্সারির সকল প্রকার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র স্থানান্তরের সুবিধা থাকে। এ ছাড়া বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া যায়। নার্সারির কাছে মিষ্টি পানির আধার থাকা খুবই জরুরি। কিছু কিছু চারা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও প্রখর রৌদ্র সহ্য করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনমতো ছাউনি ব্যবহার করে ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আবার বিক্রির জন্য মাটি থেকে চারা উত্তোলন করার পরও চারার জন্য ছাউনি ব্যবহার করা জরুরি। পশুপাখি যেন নার্সারির ক্ষতি না করতে পারে সে জন্য পাহারার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভালো জাতের চারা ও বীজ সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে চারা উত্তোলনের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রচুর পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী চারা তৈরি করতে হবে।

বীজ ও চারা সংগ্রহ:
সঠিক সময়ে হার্ডেনিং পদ্ধতি ব্যবহার করে গাছের চারা সংরক্ষণ করতে হবে বলে জানালেন কৃষিবিদ বাদল চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি জানান, হার্ডেনিং এমন একটি পদ্ধতি যা চারা সংরক্ষণ ও উত্তোলনে কিছু বিষয় মেনে চলতে হয়। চারা এমনভাবে উত্তোলন করতে হবে যেন গাছের আকার সেটির মূলের চেয়ে চার গুণ লম্বা হয়। এবং উত্তোলনের সময় প্রথমে এক পাশের শিকড় কেটে রাখতে হবে তারপর এক সপ্তাহ পরে অন্য পাশের শিকড় কেটে চারা উত্তোলন করতে হবে এতে করে চারা মরে যাওয়ার ভয় কম থাকে। চারা তৈরির বিশেষ দিকগুলো হলো বীজ সংগ্রহ ও কলমের জন্য মাতৃগাছ বাছাই করা। উন্নত প্রজাতির গাছের সায়ন সংগ্রহ করে কাঙ্ক্ষিত গাছে সঠিকভাবে স্টক প্রতিস্থাপন করতে হবে। ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে বীজ সংরক্ষণ করতে হবে যাতে জলীয়বাষ্প বীজের কোনো প্রকার ক্ষতি করতে না পারে। বর্ষার সময় এয়ারটেট পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে বীজ সংরক্ষণ করতে হবে।
লাভজনক ক্ষেত্র:
বিনিয়োগের জন্য নার্সারি একটি লাভজনক ক্ষেত্র—জানালেন এম এ হক। প্রতিবছরই বৃক্ষমেলায় হাজার হাজার বৃক্ষপ্রেমী মানুষের ভিড় জমে। বৃক্ষমেলায় বিদেশি নানা জাতের ফুল, অর্কিড ও ফলের পাশাপাশি হরেক রকম মশলাজাতীয় গাছের বেশ চাহিদা দেখা যায়। এমনকি বিদেশ থেকেও বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড, মশলা ও ফুলের চাহিদা আসে। সে অনুযায়ী নার্সারি মালিকেরা তা জোগান দিতে পারে না। এ ছাড়া বাংলাদেশে যেমন চালের বাজার, গরুর বাজার ইত্যাদি রয়েছে তেমনি নার্সারিতে উৎপাদিত গাছের জন্য কোনো বাজার নেই। একমাত্র মেলা ছাড়া নার্সারি মালিকেরা তাদের পণ্য ক্রেতার সামনে উপস্থাপনের কোনো সুযোগ পায় না। তাই নার্সারি খাতের জন্য সরকারিভাবে একটি নির্দিষ্ট বাজার প্রয়োজন, যেখানে নার্সারি মালিকেরা তাদের উৎপাদিত গাছের চারা বিপণনের সুবিধা পেতে পারে।

কেস স্টাডি:
সবুজে সচ্ছলতার ভিত গড়ছেন মনোয়ারা

নার্সারি করে আর্থিক সচ্ছলতা এনেছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর অঞ্চলের সিনাবহ গ্রামের মনোয়ারা বেগম। ২০১২ সালে বনানী মহিলা দলের মাধ্যমে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গড়ে তোলেন স্বাধীন বাংলা নামে একটি নার্সারি। এক বছরের ব্যবধানেই আবারও ঋণ নিয়ে দুই বিঘা জমি জুড়ে নার্সারিটিকে সম্প্রসারণ করেছেন তিনি। বর্তমানে মনোয়ারা বেগমের নার্সারিতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১০ হাজার সবুজ গাছের চারা রয়েছে। এই সবুজ চারাগুলো বিক্রি করেই সচ্ছলতার ভিত গড়ছেন মনোয়ারা। প্রতি সপ্তাহে ৪০০ থেকে ৫০০টি চারা বিক্রি হয়। নার্সারির আয়ের টাকা দিয়ে জমি কিনে তৈরি করেছেন বাড়ি। সন্তানদের করাচ্ছেন লেখাপড়া। মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিয়ের পর স্বামীর সংসারে অভাব-অনটন ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। অভাবের কারণে কোনো কিছুই ঠিকভাবে সামলে উঠতে পারছিলেন না। তাই অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনার আশায় সিরাজগঞ্জের চৌহালী থেকে চলে আসেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে। এখানে তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় একটা কিছু করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন মনোয়ারা বেগম। কিন্তু অর্থের অভাবে নিজে উদ্যোগী হয়ে কিছু করতে পারছিলেন না। এরই একপর্যায়ে মনোয়ারা বেগম জানতে পারেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন কালিয়াকৈরের মৌচাক ইউনিয়নে আত্মপ্রত্যয়ী মহিলাদের নিয়ে বনানী নামে একটি সঞ্চয়মূলক সমিতি গঠন করেছে। মনোয়ারা বেগম এই সমিতির সদস্য হন। সঞ্চয় করার সঙ্গে সঙ্গে সমিতির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন। অংশগ্রহণ করেন নানা রকম কর্মসূচিতে। এভাবে কিছু দিন চলার পর মনোয়ারা বেগম বনানী সমিতির মাধ্যমে আহ্ছানিয়া মিশন থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে নার্সারি গড়ে তোলার কাজে হাত দেয়। স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে নার্সারিতে শ্রম দেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে আসতে থাকে সফলতা।
মনোয়ারা বেগমের স্বামী জহিরুল জানায়, দিনমজুরি করে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। তার ওপর সব দিন কাজ জুটত না। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন চলছিল। এ সময় আমার স্ত্রী ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সদস্য হয়। পরে তাদের সমিতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে হাজার দুয়েক চারা নিয়ে একটি নার্সারি দেয়। আমি দিনমজুরের কাজ ছেড়ে নার্সারিতে কাজ করতে থাকি। অল্প কিছু দিনেই বুঝতে পারি এ ব্যবসায় লাভ ভালো। তাই গাজীপুর, নরসিংদী, টাঙ্গাইলসহ আশপাশের এলাকা থেকে ভালো চারা সংগ্রহ করতে থাকি। বর্তমানে আমাদের নার্সারিতে ১০  থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা মূল্যের ১০ হাজারের অধিক চারা রয়েছে। ঋণ পেলে ভবিষ্যতে এ নার্সারিকে আরও বড় করে গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে তাদের।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির শফিপুর শাখা ব্যবস্থাপক শমসের আলী জানান, ২৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে মনোয়ারা নার্সারিটি বড় আকারে গড়ে তোলেন। কঠোর পরিশ্রমে মনোয়ারার নার্সারিতে আগের তুলনায় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আয়ের টাকা থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে তার কোনো অসুবিধা হয় না। ধীরে ধীরে তার সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আসতে শুরু করেছে। আয় বৃদ্ধির ফলে মনোয়ারা বেগম নার্সারিটি আরও বড় আকারে গড়ে তুলতে দ্বিতীয় দফায় আবারও ৩৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে। বর্তমানে দুই বিঘা জমির ওপর বেশ বড় আকৃতির একটি নার্সারি গড়ে তুলেছেন।
ছেলে, মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী মিলে মনোয়ারা বেগমের চারজনের সংসার। ছেলে মাদরাসায় ও মেয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। নার্সারির আয় থেকেই তাদের লেখাপড়ার খরচ চলে। এদিকে নার্সারির আয় দিয়েই মনোয়ারা বেগম মাথা গোঁজার মতো ছোট একটি জায়গা কিনেছেন। এখানে ঘর তুলে বসবাসও শুরু করেছেন। মনোয়ারা বেগম নিজেকে একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মনোবল ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে শত বাধা অতিক্রম করে কীভাবে জীবনে সফলতা অর্জন করা যায় তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মনোয়ারা বেগম।
শুরুর কথা : টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার মেয়ে মনোয়ারা বেগমের বিয়ে হয় সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালি থানার দিনমজুর জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। বিয়ের পর অভাবের তাড়নায় স্বামী-স্ত্রী চৌহালী ছেড়ে চলে আসে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার সিনাবহ গ্রামে। এ গ্রামেই অন্যের জায়গায় স্বামীসহ বসবাস শুরু করেন তিনি। তারপর স্থানীয় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি নেয়। কিন্তু মনোয়ারা বেগম ও দিনমজুর স্বামী জহিরুলের আয় দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছিল। সংসারের আয় বাড়াতেই মনোয়ারা বেগম নার্সারি গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তারপর ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সদস্য হয়ে ২৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের নার্সারি।
বর্তমানে মনোয়ারা বেগমের নার্সারিতে প্রায় তিন লাখ টাকা মূল্যের ১০ হাজারের অধিক চারা রয়েছে। নার্সারিতে কাজের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে দু’জন কর্মচারী। নার্সারি ব্যবসায় মনোয়ারা বেগমের সফলতা দেখে আশপাশের বেশ কয়েকটি অভাবী পরিবার নার্সারি ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।

নার্সারী করে স্বামী পরিত্যক্তা সংগ্রামী নারী সাজি বেগম আত্মকথা
কুড়িগ্রাম জেলার ভুরম্নঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমর নদী বিধৌত একটি অবহেলিত গ্রাম ছিট পাইকেরছড়া নদী ভাঙ্গনের অবলীলায় চর এর আশীর্বাদ স্বরম্নপ জন্ম গ্রামটির। যেখানে সভ্যতার ছোয়া লাগেনি আজও। অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার যেখানে সমাজের অলংকার সেই গ্রামেই জন্ম সাজি বেগমের। বাবা আবু ব্‌ক্কর ছিদ্দিক মাতা জরিনা খাতুন, পিতামাতার ৬ সনত্মানের মধ্যে ১ম। বাবা পেশায় জেলে হওয়ায় দুঃখ দরিদ্রতার মধ্যে লেখা পড়া হয়নি সাজি বেগমের, অর্ধাহারে অনাহারে খেয়ে না খেয়ে যখন স্কুলে যাবার কথা তখন সাজি বেগম ঐ বয়সে করতে হত অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ। ফলে বিদ্যাঙ্গনে পা রাখা তার সৌভাগ্যে জোটেনি।
সামাজিক কুসংস্কার এবং নিজ অজ্ঞতার কারনেই মাত্র ১২/১৩ বছর বয়সে তার বাবা তাকে পাইকেরছড়া ইউপির দলবাড়ি নামক গ্রামের দিনমজুর লোকমান হোসেনের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ে হল সাজির কিন্তু মুক্তি পেলনা সাজির মৌলিক চাহিদাগুলি। বাবার বাড়ির দুঃখ স্বামীর বাড়িতে এসে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়।  সাজি বেগমকে ঠিক মত ভরনপোষন দিত না তার স্বামী। সাজির বাবা কন্যা দায় থেকে মুক্তি পেল তবে মেয়েকে দুঃখের জ্বলনত্ম আগ্নেয়গীরিতে নিক্ষেপ করে। সাজি বেগমের এই বিভীষিকা ময় জীবনে প্রকৃতির নিয়মে সাজি অনত্মঃস্বত্বা হয়ে পড়লে স্বামীর নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পায়, স্বামী লোকমান হোসেন এরই মধ্যে ১ম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই অন্য মহিলাকে বিয়ে করে। অসহায় সাজি বেগম জীবনের এই অসহনীয় চরাই উৎরাই এর মধ্যে কোন উপায় না পেয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে কিন্তু প্রকৃতির বিধান এরই মধ্যে তার কোল জুড়ে পুত্র সনত্মানের আগমন ঘটে। সনত্মান পেয়ে মায়ের মন শত দুঃখের মধ্যে ভরে উঠলেও ভরেনি বাবা লোকমান হোসেনের মন। অবশেষে সাজি বেগমের কাছে চলে আসে তালাক নামা। নিজের জীবন ও সনত্মানকে অন্ধের ষষ্টী ভেবে শুধু মাত্র বেঁচে থাকতেই ”ঝি” হিসাবে তার এক দুর সম্পর্কের মামাতো বোনের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করে। শুরু করে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামী জীবন। সাজি বেগমের জীবন যুদ্ধে অপরাজিতা সৈনিক হিসাবে সে ২০১০ সালে ব্র্যাক-ভুরম্নঙ্গামারী শাখা অফিসের আওতায় নৎধপ-পভঢ়ৎ-ঃঁঢ় প্রোগ্রামে অতিদরিদ্র সদস্যা নির্বাচনের কাজ শুরু করলে চজঅ পদ্ধতির মাধ্যমে সাজি বেগম অতিদরিদ্র উপকারভোগী হিসাবে চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত হয়। তার পুর্ব অভিজ্ঞতা ও পছন্দ অনুযায়ী এন্টারপ্রাইজ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ”নার্সারী” কেই বেছে নিলে উক্ত এন্টারপ্রাইজের উপর তাকে ২৬/৬/২০১০ হতে ২৮/৬/২০১০ ইং পর্যন্ত মোট ০৩ দিনের প্রশিক্ষন প্রদান করা হয় এবং ২৯/৬/২০১০ ইং তারিখে ১০ শতক জমি লীজ সহ নার্সারীর জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল প্রদান করা হয়।
নার্সারীর জন্য জমি লীজ সহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় মালামাল পাওয়ার পর সে অতিযত্ন সহকারে কাজ শুরু করতে থাকে এবং তাকে প্রদানকৃত প্রশিক্ষনের মাধ্যমে তার কর্মদক্ষতার বাস্তব প্রতিফলন স্বরুপ তার নার্সারীর চারার মান সর্বাপেক্ষা উন্নত হওয়ায় বাজারে চারার সর্ব্বচ্য মূল্য পায়। সময়ের পরিবর্তন হতে শুরু করেছে সাজি বেগমের জীবন। ১ম ধাপে সে ৪২০০০/= (বিয়ালিস্নশ হাজার) টাকার চারা বিক্রি করে ও ১৮ শতক জমি বন্ধক নেয় ২৫০০০/= (পঁচিশহাজার) টাকায় ও একটি ভ্যান ক্রয় করে। ৩৫০০/= (তিনহাজার পাঁচশত) টাকায় । ২য় ধাপে ২০০০০/= (বিশহাজার) টাকার চারা বিক্রয় করে উক্ত টাকা দিয়ে ১২ শতক জমি লীজ নেয় ৫০০০/= (পাঁচ হাজার) টাকায় এবং ১টি দো-চালা টিনের ঘর নির্মান করে এ ছাড়াও চারা বিপননের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বচল রাখতে ১টি মোবাইল ফোন ক্রয় করে। এদিকে সহযোগী সম্পদ হিসাবে প্রদান কৃত ১টি ছাগল থেকে ৩টি ছাগল হয়েছে ও তার মুরগী রয়েছে ১৯টি এবং সঞ্চয় হিসাবে জমা আছে বর্তমানে ৬২০০/=(ছয় হাজার দুইশত)টাকা মাত্র।
আর্থিকভাবে সাজি বেগম এখন স্বচ্ছলতার ক্রমধারায় ও সামাজিকভাবেও বেড়েছে তার কদর। পেটের ক্ষুধার নিবারনের জন্য আর তাকিয়ে থাকতে হয় না কে, কখন কাজের জন্য ডাকবে তাকে নিয়মিত হাতে কলমে শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সে ১২টি ইস্যু যথারীতি রপ্ত করেছে এবং সে অনুযায়ী চলছে উক্ত গ্রামের এউইঈ কমিটিকে সে চিনে ও জানে। তার ছেলে সুজন মিঞা ৯ম শ্রেনীতে অধ্যয়ণ অবস্থায় লেখাপড়া বাদ দিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করত এখন সে আবারও পড়াশোনা শুরু করেছে এবং ২০১২ সালে ভুরুঙ্গামারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পরীক্ষা দিবে। চলতি বছরে অত্র উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর কর্তৃক আয়োজিত বৃক্ষ মেলা”২০১১ ইং তে অংশ  গ্রহণ করে ২য় স্থান অধিকার করে ও ১টি স্প্রে মেশিন পুরষ্কারসহ ১টি সনদ পত্রও লাভ করে। বর্তমানে সাজি বেগমের ভাগ্যাকাশে উন্নতির শিশির পতিত হয়েছে। সাজি বেগম আজ আর ভাগ্যাকাশে কারো মেঘ দেখছে না । এখন সে ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে বাড়ির জন্য ভিটা জমি ও নার্সারীর জমি ক্রয় করে নিজস্ব জমিতে নার্সারী ও বাড়ি করবে এবং তার ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে।

তথ্য:
তথ্য আপা প্রকল্প

Written By
More from uddoktahub

ব্যবসায় কম্পিটেটিভ এডভান্টেজ : কেসস্টাডিতে সহজপাঠ

আমাদের নবীন উদ্যোক্তাদের অনেকেই একটি বিষয়ে ধারনা রাখেন না। এটি হচ্ছে কম্পিটেটিভ...
বিস্তারিত পড়ুন...

Leave a Reply