সুগন্ধি বানিয়ে উপার্জন

ভুমিকা
উৎসব-পার্বণ এলে বেড়ে যায় সুগন্ধির ব্যবহার। আর যাঁরা অফিস কিংবা অনুষ্ঠানের যান তাঁদের জন্য ঘর থেকে পা ফেলার আগে সুগন্ধি অপরিহার্য। তাই এর বিক্রিও বেশ ভালো। হাতে কিছু পুঁজি থাকলে আপনিও শুরু করতে পারেন সুগন্ধি উৎপাদন।
আয়-ব্যয়
৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করা যায়। মান অনুযায়ী প্রতি বোতল সুগন্ধি ১০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। আমাদের দেশে সুগন্ধির ভালো বাজার রয়েছে। দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজার ধরার জন্যও চেষ্টা করতে পারেন। বাজার ধরতে পারলে মূলধন নিয়ে ভাবতে হবে না। তিন মাসের মধ্যেই লাভের মুখ দেখবেন আপনি।
সুগন্ধির রকমফের
উৎসভেদে কয়েক প্রকারের সুগন্ধি রয়েছে। যেমন- ফ্লোরাল, মসলা বা স্পাইসি, অ্যালকোহলিক ইত্যাদি। ফুল থেকে যে সুগন্ধি তৈরি হয় সেগুলো ফ্লোরাল গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। স্পাইসি বা মসলা সুগন্ধি লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ, এলাচি প্রভৃতি মসলা থেকে তৈরি হয়। অ্যালকোহলিক জাতীয় সুগন্ধিতে মূলত বিশ্বের নামকরা অ্যালকোহল ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া চামড়া বা তামাক এমনকি বিভিন্ন জাতের গাছের নির্যাস যেমন চন্দন কাঠ, কস্তুরি, জাফরান, আগর, ভ্যানিলা, বালসামের মিষ্টি গন্ধ থেকেও নানা ধরনের সুগন্ধি তৈরি হয়।
কিভাবে তৈরি করবেন
এ জন্য অবশ্যই আপনাকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। একেক ধরনের সুগন্ধি তৈরির প্রক্রিয়া একেক রকম। ফ্লোরাল সুগন্ধি তৈরিতে বেলি, রজনীগন্ধা, গোলাপ, হাসনাহেনা ইত্যাদি তাজা ফুলের পাপড়ি ব্যবহৃত হয়। এ সুগন্ধি তৈরি করতে প্রথমে তাজা ফুলের পাপড়ি আলাদা করে পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর পাপড়িগুলো বিশেষ কাচের পাত্রে পানিতে ১০-১২ দিন রাখতে হবে। একসময় পানির ওপর তেলজাতীয় পদার্থ দেখা যাবে। কয়েক দিন পর তেলজাতীয় পদার্থ ফেনা বেঁধে পানির ওপর ভাসতে থাকবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার তুলা দিয়ে ফেনাগুলো সংগ্রহ করলেই সেখান থেকে তৈরি হবে আতর।
বাজারজাতকরণ
ব্যবসা করার জন্য বৈধ কাগজপত্র তৈরি, প্রশাসনের অনুমতি, সুগন্ধি বানানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন, অভিজ্ঞ লোক নিয়োগ, একই সঙ্গে সুগন্ধির গুণগত মান ঠিক রাখা ইত্যাদি ভেবে রাখতে হবে। এরপর বাজারজাতকরণ নিয়ে ভাবতে হবে। বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে প্রচারের কোনো বিকল্প নেই। ব্যবসা শুরুতে ছোট করে করাই ভালো। অভিজ্ঞতা বাড়লে তখন ব্যবসার পরিধি বাড়াতে হবে। সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনসহ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুগন্ধির প্রচারের কাজ করতে পারবেন। এ ছাড়া প্রচার এবং বিক্রির জন্য সুগন্ধির স্যাম্পল বিভিন্ন গিফটশপে দিতে পারেন। পরে চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার নিয়ে বিপণনকেন্দ্রগুলোতে সুগন্ধি সরবরাহ করার সুযোগ পাবেন। এ জন্য দোকান মালিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।
জেনে রাখুন
সুগন্ধি তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সুগন্ধির নাম ও প্যাকেট আকর্ষণীয় ও মানসম্পন্ন করার চেষ্টা করুন। সুগন্ধির ঘ্রাণ যেন ভালো হয় সেদিকে লক্ষ রাখুন। কারণ এর ওপরই নির্ভর করবে আপনার ব্যবসা। তাই গুণগত মান বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
বিভিন্ন খ্যাতনামা কসমেটিকস, জেনারেল স্টোরের নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহে রাখুন। প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের সময় অবশ্যই অভিজ্ঞতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিন।
পরামর্শের জন্য যোগাযোগ
নকশা কেন্দ্র
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)
১৩৭-১৩৮ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা। ফোন : ৯৫৫৩১১২

কেস স্টাডি:
অর্থনৈতিক অপার সম্ভাবনার সূজানগরের সুগন্ধি আতর ও আগর

বাংলাদেশের আগর শিল্প হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রার্জন ও বেকারদের কর্মসংস্থানের বড় মাধ্যম। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কাঁচামালের সমস্যা নিরসনসহ সহজশর্তে ঋণ সুবিধা পেলে ব্যক্তি উদ্যোগে আগরের চাষ বৃদ্ধি পেতে পারে। আগরের চাষাবাদ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদিত আতর বিদেশে রফতানির মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে বলে মনে করছেন আগর চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ফলে আগর ব্যবসায়ীরা মনে করছেন যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে আগরের সুগন্ধিতে অর্থনৈতিক সুবাতাস বইতে পারে। আগর গাছের ইংরেজি নাম একোলিয়ারা একোলোহা। ৭ বছরে ৬০-৭০ ফুট উঁচু আগরগাছ পূর্ণতা লাভ করে। মোগল আমলে দেশ-বিদেশের সম্রাটদের দূতের আগমন ঘটত বড়লেখা উপজেলার সুজানগরে। আগরের নির্যাস থেকে প্রাপ্ত আতরের একমাত্র উৎপাদনস্থল ছিল মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর। দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও পৃষ্ঠপোষকতা, কাঁচামাল ক্রয়ে জটিলতা ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে আগর শিল্প বিলুপ্তির পথে। আশার কথা হল, ১৯৯৪-৯৫ সালে প্রথম আগরের গুরুত্ব অনুধাবন করে পরীক্ষামূলক চাষের উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ। এ সময় ২ হাজার ৫শ আগরের চারা রোপণ করা হয় শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া ও লাঠিটিলা পাহাড়ে। ১৯৯৬ সালে সরকার এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার পর প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার আগর চারা লাগিয়ে বনায়নের কাজ শুরু করা হয়। ৫ বছরে এর সফলতা দেখে ২০০০ সালে আরও একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। আতরের কাঁচামালের স্বল্পতা ও আগর বিলুপ্তি রোধে সরকার কর্তৃক প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ। এ পর্যন্ত ১২টি পাহাড়ি এলাকার ৩৫২ হেক্টরে ৩ লাখ ৪০ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৪০ বছরের মধ্যে আগর বিলুপ্তির আশঙ্কা কেটে যাবে বলে বন বিভাগের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। সিলেট বিভাগের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার লাউয়াছড়া, মাগুরছড়া, তারাকান্দি, বড়লেখা ও জুড়ী; হবিগঞ্জের সাতছড়ি, চুনারুঘাট, রঘুনন্দন ও কালেঙ্গাম এবং সিলেটের কাদিমপাড়া ও শ্রীমঙ্গলের মৌলভীবাজার রেঞ্জের আওতায় সাতগাঁও বিটের পাহাড়ি ন্যাড়া ভূমিতে অংশদারিত্বের ভিত্তিতে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার আগরের চারা রোপণ করা হয়েছে, যা সরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভিত্তিতে আগর চাষ ও আগর শিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের অভিমত। বর্তমানে দেশের আগরের নির্যাস থেকে আতরের কারখানা রয়েছে বড়লেখার সুজানগরে ও সিলেটের কাদিমনগরে। এরমধ্যে সুজানগরে রয়েছে ৩০০টি আগরের কারখানা। এখানে ব্যক্তি উদ্যোগে আগরের চাষ করা হচ্ছে। সরকারিভাবে এখনও কোনো আগরের কারখানা করা হয়নি। বড়লেখার সুজানগরের আতরের কারখানা থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৪ হাজার বোলা আতর সংগৃহীত হয়, যার বাজার মূল্য ৫ কোটি টাকা বলে আতর কারখানার মালিকরা জানান। আগরচাষিদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, সরকারি উদ্যোগে আগর বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এবং পৃষ্ঠপোষকতাসহ সহজশর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে ব্যক্তি উদ্যোগে আগরের চাষ বৃদ্ধি পাবে। ফলে আগরের চাষাবাদ বৃদ্ধি ও আতর বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে সরকার। বড়লেখা উপজেলার সুজানগরের প্রবাসী আলহাজ শামছুল হক জানান, তিনি ৫০ বিঘা জমিতে আগর চাষ করেছেন। এখানকার বন বিট কর্মকর্তা মনিরুল হক জানান, সরকারি উদ্যোগে বন বিভাগ মাধবছড়া বিটে ৭০ হেক্টর ভূমিতে ১ লাখ ১২ হাজার আগর চারা রোপণ করা হয়েছে। আগরচাষিরা অভিযোগ করেন, একটি পরিপূর্ণ গাছ কাটতে তাদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন গাছ কাটার আগে ভূমি অফিস থেকে হোম পারমিট, বন বিভাগ থেকে ট্রানজিট পাস ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হয়রানির শিকার হতে হয়। আগরগাছ কাটার ক্ষেত্রে এসব নীতিমালা সহজ করার দাবি জানান তারা। অপরদিকে ব্যবসায়ীরা জানান, আগর থেকে অতি মূল্যবান সুগন্ধি তেল উত্পন্ন হয়। বিদেশে যার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। আগর তেল ও আগরগাছের কাঠের টুকরো দুবাই, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, ভারত ও সিঙ্গাপুরে অতি উচ্চ মূল্যে বিক্রি হয়। আগর ব্যবসায়ী আবদুল করিম, ইমান উদ্দিন, কবির আহমদ, বদরুল ইসলাম, আবদুল জলিল, হোসেন আহমদ, তৈয়বুর রহমান ও আবদুস শহিদ জানান, ভারত যেভাবে বিদেশ থেকে আগরের কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। সেভাবে বাংলাদেশ বিদেশ থেকে আগরের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পেলে দেশি কাঁচামালের সংমিশ্রণে যে তেল উৎপাদন করা যাবে তা হবে।
তথ্য:
তথ্য আপা প্রকল্প

Written By
More from uddoktahub

ব্যবসায় কম্পিটেটিভ এডভান্টেজ : কেসস্টাডিতে সহজপাঠ

আমাদের নবীন উদ্যোক্তাদের অনেকেই একটি বিষয়ে ধারনা রাখেন না। এটি হচ্ছে কম্পিটেটিভ...
বিস্তারিত পড়ুন...

Leave a Reply